হারানো স্মৃতি গুলো

এই যে মিস্টার,
খুব ভাব হয়েছে, তাই না? এতটা বদলে গেলে? আমি কিন্তু সেই আগের মতই আছি। একটুও বদলাইনি। ঠিক আগের মতই আছি। যেই তুমি আমাকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারতে না সেই তুমি কিভাবে এখন আছো? তোমার মনে আছে, সেই প্রথম দিনের কথা? আমি তো লজ্জায় লাল আর তোমার সাথে প্রথম দেখা করার আনন্দে তোতলামি করছিলাম। আর তুমি হেসেই খুন। আমি কিন্তু ভুলিনি। তোমার শত ব্যস্ততায় ও সময় করে দেখা করতে। যোগাযোগেরও কোন কমতি ছিল না। কত সময়, কত পথ পাড়ি দিয়েছি, দুজনে একসাথে।

কিন্তু আজ, কিভাবে এত বদলে গেছো? আমি ভাবতেই পারি না। তোমার মনে আছে, পার্কে বসে আমি বলছিলাম কাঠগোলাপ আমার খুব পছন্দ। আর তুমি বাদরের মত লাফ দিয়ে হাঁটতে লাগলে। পিছনে দৌড়ে ও কূল পাচ্ছিলাম না আমি। হনহন করে ইয়া বড় এক কাঠগোলাপ গাছে উঠে ফুল নিয়ে আসলে আমার জন্য। আর আমি রাগ করে তোমাকে যা না তা শুনিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি জানো না, আমি কতটাই না খুশি হয়েছিলাম। এই তো সেদিন আমি কৃষ্ণচূড়া ফুলের প্রসঙ্গ তুলতে না তুলতেই পরের দিন তুমি হঠাৎ করে উধাও। তার পরেরদিন বাসার সামনে এসে হাজার খানেক কল করলে। কিন্তু আমার খুব অভিমান। তাই কলটি বারবার কেটে দিচ্ছিলাম। আর তুমি প্রায় তিন ঘন্টা গেইটের সামনে কৃষ্ণচূড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলে। তোমার ভালোবাসার কাছে আমার অভিমান শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছিল। একদিন কী হল! আমি নীলক্ষেত দিয়ে যাবার সময় কোন কারন ছাড়াই একটা বই হাতে নিলাম। আর তুমি সেদিন বিকেলেই কুড়ি খানেক বইয়ের প্যাকেট নিয়ে হাজির।

অন্য একটা দিনের ঘটনা বলি, আমি তোমার জন্য পুডিং বানিয়ে নিয়ে আসলাম। তুমি তা না খেয়ে রেখে দিলে ফ্রিজে স্মৃতি হিসেবে। কতটাই পাগল ছিলে। এ কয়েক মাসে তোমাকে অনেক খুঁজেছি। কিন্তু কোথাও পাই নি। তোমার সে অফিস, বাসা। কোথাও পাই নি। আর ফোন নাম্বারে প্রতিদিন কল করেছি। কিন্তু চির চেনা সেই কন্ঠস্বরটি বারবার বলছিল The number you have dialed, can’t be reached at this moment. আর ফেইসবুক, মেসেঞ্জার সবই যোগাযোগের বাইরে। কোন রিপ্লাই তো দূরের কথা দেখই না। তাই আজ চিঠি লিখতে বসেছি। কিন্তু এটা কোন ঠিকানায় পাঠাবো জানি না। তোমার কী মনে আছে, তুমি বলতে, আমার মন খারাপ তোমার একদম ভালো লাগে না। তুমি সহ্য করতে পারো না। কিন্তু আজ আমার মন ভালো হবার আর কোন উপক্রম নেই। কখনো ভাবিনি, কোন ঝামেলা ছাড়াই আমাদের বিয়েটা হয়ে যাবে। আচ্ছা সে রাতের কথা তোমার মনে আছে ? ছাদে বসে আমি একের পর এক কবিতা আর তুমি গান গাচ্ছিলে। জানো, আমি এখন তোমার অস্তিত্ব আমার মাঝে অনুভব করছি। কিন্তু তোমাকে এ খবরটা দিতে পারছি না। কী করেই বা দেব? তোমাকে তো আর খুঁজেই পাচ্ছি না। সেদিন রাতের কথা মনে আছে, তুমি আর আমি বান্দরবন, কক্সবাজারে হানিমুন শেষে গ্রীনলাইন পরিবহনে করে ঢাকায় ফিরছিলাম। গল্প করছিলাম দুজনে। কখন যে ঘুমিয়ে গেলাম টেরও পেলাম না। তবে ঘুমের মধ্যে তোমার হাতটুকু আঁকড়ে ধরে ছিলাম। ঘুম ভেঙে নিজেকে আবিষ্কার করলাম ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে। তোমার কথা জানতে চাইলে পরিচিত মানুষগুলো মুখ ফিরিয়ে নিল।

জানো, তোমার সেই চঞ্চল অধরা এখন আর সেই চঞ্চলটি নেই। কেমন যেন শান্ত হয়ে গেছে। একদমই শান্ত। নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি বাইরের পরিবেশ থেকে। লক্ষ্মীটি প্লিজ একবার ফিরে আসো। জানো, এখন নিয়ম করে সেই গোলাপি শাড়িটা পড়ে, অবাধ্য চুলগুলোকে সামলানোর জন্য ছোট্ট একটা পাঞ্চক্লীপ দিয়ে আটকিয়ে দিই। তারপর চোখের কোঠরে হালকা করে একটু কাজল দিই। আর ডাইনিং জুড়ে তোমার পছন্দের খাবার গুলো সাজিয়ে বসে থাকি। তোমার জন্য সাতক্ষীরার চিংড়ি আনিয়েছি। নারকেল চিংড়ি, কলমি শাকের ঝোল, পাবদামাছ, কাঁঠালের বিচি দিয়ে মোরগ রান্না করে টেবিল সাজিয়ে অপেক্ষা করি। কখনো বা সদর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকি, যেন তোমাকে বেল চেপে অপেক্ষা করতে না হয়। বিকেলবেলা, যখন অফিস থেকে বাসায় ফেরার সময় হয় তখন বেলকুনিতে গিয়ে তোমার পথ পানে চেয়ে থাকি। ছাদের সে গাছগুলোতে আমি প্রতিদিন পানি দিই। ইতোমধ্যে ফুল ফুটতে শুরু করেছে। আর আমাদের টিয়া পাখিটা কে তোমার নামটা বলতে শিখিয়েছি। সে সারাদিন তুষার… তুষার বলে আমার মাথা খারাপ করে দিচ্ছে। কবে তোমার অভিমান ভাঙবে!

লেখক পরিচিতি

নাম- মাহমুদা তুহিন

জন্ম- ১৯৯৩ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগরে। বর্তমানের ঢাকার আজিমপুরে থাকেন।

ইডেন মহিলা কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ছাত্রী। ইতোমধ্যে বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেছেন। লেখালেখির মাধ্যমে সবাইককে আনন্দ দিতে ভালোবাসেন।
লিখেছেন – ডায়েরীর পাতা থেকে

গল্পটি বিয়েটা ডট কম-এর “Valentines Day Love Story Contest 2017” -এর বিজয়ীর।

Share on

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.